গ্লোবাল মানের শিক্ষা বিপ্লব-বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে বড় ধরনের সংস্কারের ইঙ্গিত দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন।
দায়িত্ব গ্রহণের পর গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি স্পষ্টভাবে জানান, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করা হবে।
তার ভাষায়, বর্তমান বিশ্ব একটি “গ্লোবাল ভিলেজ”-এখানে শিক্ষা আর স্থানীয় পণ্য নয়, বরং এটি একটি আন্তর্জাতিক সম্পদ।
তাই সময়ের চাহিদা অনুযায়ী গ্লোবাল মানের শিক্ষা বিপ্লব বাস্তবায়নই এখন সরকারের অগ্রাধিকার।
কেন প্রয়োজন গ্লোবাল মানের শিক্ষা বিপ্লব?
বিশ্বায়ন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের (Fourth Industrial Revolution) প্রভাবে বিশ্বজুড়ে শিক্ষা ব্যবস্থায় দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে।
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং প্রযুক্তি জ্ঞান বাড়ানো জরুরি।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের শিক্ষা কাঠামোকে এমনভাবে সাজানো হবে যাতে তা আন্তর্জাতিক মান (International Standard) পূরণ করতে সক্ষম হয়।
শিক্ষার্থীরা যেন দেশ-বিদেশে সমানভাবে প্রতিযোগিতা করতে পারে-এটাই হবে নতুন শিক্ষানীতির মূল লক্ষ্য।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও আধুনিক প্রযুক্তিতে গুরুত্ব (গ্লোবাল মানের শিক্ষা বিপ্লব)
মন্ত্রী বিশেষভাবে উল্লেখ করেন ন্যানোটেকনোলজি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI), বায়োটেকনোলজি ও আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার কথা।
এসব বিষয়ে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি না করলে ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে টিকে থাকা কঠিন হবে বলে তিনি মত দেন।
এছাড়া শিক্ষা ও শিল্পখাতের মধ্যে কার্যকর সংযোগ (Industry-Academia Linkage) গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
এতে শিক্ষার্থীরা বাস্তবমুখী জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে।
টিভেট ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষায় জোর
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ (TVET) খাতকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনার কথাও জানান শিক্ষামন্ত্রী।
তার মতে, শুধু সনদনির্ভর শিক্ষা নয়, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা সম্প্রসারণই টেকসই উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি।
দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হলে কারিগরি প্রতিষ্ঠান, পলিটেকনিক ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আধুনিকায়ন করা হবে। এতে দেশীয় শিল্পখাত যেমন উপকৃত হবে, তেমনি বৈদেশিক কর্মসংস্থানেও নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।
দল-মত নির্বিশেষে উন্নয়নের অঙ্গীকা
আ ন ম এহসানুল হক মিলন বলেন, তিনি দল-মত নির্বিশেষে সবার জন্য কাজ করবেন।
শিক্ষা উন্নয়নের পাশাপাশি মাদকমুক্ত ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
তার স্বপ্ন-দেশের প্রতিটি উপজেলা শিক্ষা, সুশাসন ও সামাজিক উন্নয়নে মডেল হিসেবে গড়ে উঠুক।
শিক্ষামন্ত্রীর শিক্ষা ও পেশাগত পটভূমি (গ্লোবাল মানের শিক্ষা বিপ্লব)
শিক্ষামন্ত্রী পূর্বেও শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন শের-ই বাংলা নগর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবং উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করেন গভর্নমেন্ট ইন্টারমিডিয়েট টেকনিক্যাল কলেজ থেকে।
পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে New York Institute of Technology থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেন।
তিনি Brooklyn College এবং Borough of Manhattan Community College-এ সহকারী প্রভাষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
পরবর্তীতে International Islamic University Malaysia থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
তার বহুমাত্রিক শিক্ষা ও পেশাগত অভিজ্ঞতা শিক্ষা খাতে সংস্কার কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
পাঠকের প্রশ্ন-উত্তর পর্ব – গ্লোবাল মানের শিক্ষা বিপ্লব
- গ্লোবাল মানের শিক্ষা বিপ্লব কী?
গ্লোবাল মানের শিক্ষা বিপ্লব হলো বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার উদ্যোগ। - শিক্ষামন্ত্রী কারা এই ঘোষণা দিয়েছেন?
এই ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন। - কেন শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন জরুরি?
বিশ্বায়ন ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রেক্ষাপটে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির জন্য শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন। - কোন খাতে জোর দেওয়া হবে?
ন্যানোটেকনোলজি, AI, বায়োটেকনোলজি এবং কারিগরি শিক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া হবে। - টিভেট কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?
টিভেট হলো কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ। দক্ষতা বাড়ানোর জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। - শিক্ষার আন্তর্জাতিক মান কী বোঝায়?
এতে পাঠ্যক্রম, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার্থী দক্ষতা আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। - শিক্ষা ও শিল্পের সংযোগ কীভাবে হবে?
Industry-Academia linkage গড়ে শিক্ষার্থীরা বাস্তব অভিজ্ঞতা ও কর্মসংস্থান সুযোগ পাবে। - শিক্ষামন্ত্রীর লক্ষ্য কী?
সকল শিক্ষার্থীকে গ্লোবাল কম্পিটিটিভনেসে সক্ষম করা এবং দেশকে দক্ষ মানবসম্পদে সমৃদ্ধ করা। - দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির গুরুত্ব কী?
উন্নত প্রযুক্তি খাত, বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য এটি অপরিহার্য। - শিক্ষা সংস্কার কখন শুরু হবে?
মন্ত্রী জানিয়েছেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর কয়েক দিনের মধ্যে ধাপে ধাপে সংস্কার কার্যক্রম শুরু হবে।
গ্লোবাল মানের শিক্ষা বিপ্লব
- কেন বাংলাদেশকে গ্লোবাল ভিলেজে বিবেচনা করা হচ্ছে?
কারণ প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক সংযোগের মাধ্যমে দেশগুলো এখন বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে যুক্ত। - কারিগরি শিক্ষা কাদের জন্য প্রয়োজন?
শিক্ষার্থী ও তরুণ পেশাজীবীদের জন্য যাতে তারা দক্ষ এবং কর্মক্ষেত্রে প্রস্তুত হয়। - চতুর্থ শিল্পবিপ্লব কী?
এটি হলো ন্যানোটেকনোলজি, AI, রোবটিক্স ও আধুনিক প্রযুক্তির যুগ যা শিল্প এবং শিক্ষায় বিপ্লব ঘটাচ্ছে। - শিক্ষামন্ত্রী দলের বাইরে কার জন্য কাজ করবেন?
দল-মত নির্বিশেষে সকলের জন্য শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়ন কার্যক্রমে কাজ করবেন। - শিক্ষা সংস্কারের ফলে শিক্ষার্থীরা কী পাবে?
উচ্চমানের শিক্ষার সঙ্গে বাস্তব দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও বৈদেশিক প্রতিযোগিতার সুযোগ। - গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন কী বোঝায়?
শিক্ষা কাঠামো, পাঠ্যক্রম ও প্রশিক্ষণ আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা। - শিক্ষামন্ত্রীর পেশাগত অভিজ্ঞতা কী?
তিনি রসায়নবিদ, শিক্ষক এবং গবেষক হিসেবে অভিজ্ঞ, এমবিএ ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। - কারিগরি ও বিজ্ঞান শিক্ষায় কি উন্নয়ন হবে?
হ্যাঁ, আধুনিক ল্যাব, পাঠ্যক্রম ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োগে গুরুত্ব দেওয়া হবে। - কেন শিক্ষার আন্তর্জাতিক মান জরুরি?
কারণ শিক্ষার্থীরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় যোগ্য হতে এবং আন্তর্জাতিক চাকরিতে সফল হতে পারবে। - শিক্ষা সংস্কারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য কী?
দেশকে দক্ষ মানবসম্পদে সমৃদ্ধ করা, প্রযুক্তি ভিত্তিক অর্থনীতি তৈরি করা এবং আন্তর্জাতিক মানে শিক্ষায় নেতৃত্ব দেওয়া।
উপসংহার
বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উপযোগী পাঠ্যক্রম, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণের সমন্বয় ঘটিয়ে গ্লোবাল মানের শিক্ষা বিপ্লব বাস্তবায়নের লক্ষ্যই এখন প্রধান আলোচ্য বিষয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বিশ্ব প্রতিযোগিতায় আরও শক্ত অবস্থান নিতে সক্ষম হবে।
সম্পাদকঃ
মোঃ নাইয়ার আযম,সহকারী অধ্যাপক(পদার্থবিজ্ঞান),মজিদা খাতুন মহিলা কলেজ, রংপুর।

নাইয়ার আযম একজন নিবেদিতপ্রাণ পদার্থবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক। তিনি মজিদা খাতুন মহিলা কলেজ,রংপুর এ কর্মরত আছেন এবং Studentbarta.com-ওয়েব সাইডের সম্পাদক। তিনি শিক্ষা ও অনলাইন শিক্ষার প্রতি গভীরভাবে অনুরাগী এবং নিয়মিতভাবে শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করার মতো চিন্তাশীল লেখা প্রকাশ করেন। তার শিক্ষা জীবন শুরু হয় ক্যান্ট পাবলিক স্কুল থেকে এবং পরবর্তীতে তিনি কারমাইকেল কলেজ, রংপুর-এ উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। বর্তমানে রংপুর সিটি-তে বসবাসরত নাইয়ার আযম সবসময় শিক্ষা, অনলাইন লার্নিং এবং শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে আগ্রহী। পদার্থবিজ্ঞানের জ্ঞানকে সহজবোধ্যভাবে উপস্থাপন এবং আধুনিক শিক্ষার সুযোগ প্রসারে তিনি বিশেষভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।



