স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা ২০২৭: তিন বিষয়ে ১০০ নম্বর, শিক্ষার্থীরা যেভাবে প্রস্তুতি নেবে

স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা ২০২৭ নিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

দেশের সরকারি-বেসরকারি বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে এতদিনের লটারি পদ্ধতির পরিবর্তে আবারও ভর্তি পরীক্ষা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।

নতুন পদ্ধতি কার্যকর হলে শিক্ষার্থীদের মেধা যাচাইয়ের মাধ্যমে তৈরি করা হবে মেধাতালিকা, আর সেই তালিকা অনুযায়ী ভর্তির সুযোগ পাওয়ার কথা রয়েছে।

এ লক্ষ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) ইতোমধ্যে একটি খসড়া নীতিমালা প্রস্তুত করেছে।

এটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর চূড়ান্ত নীতিমালা প্রকাশ করা হবে।

প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি কার্যক্রমে নতুন এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-ভর্তি পরীক্ষায় মোট ১০০ নম্বর থাকবে এবং পরীক্ষা হবে বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে।

ফলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের এখন থেকেই প্রস্তুতির বিষয়ে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।

স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা ২০২৭-এ পরীক্ষা হবে যেসব বিষয়ে

খসড়া নীতিমালা অনুযায়ী দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণিতে ভর্তির জন্য মোট ১০০ নম্বরের পরীক্ষা নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

তিনটি বিষয়ের মধ্যে গণিতে সর্বোচ্চ ৪০ নম্বর এবং বাংলা ও ইংরেজিতে ৩০ নম্বর করে রাখা হয়েছে।

বিষয়নির্ধারিত নম্বর
বাংলা৩০
ইংরেজি৩০
গণিত৪০
মোট১০০

পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা যে ফলাফল অর্জন করবে, তার ভিত্তিতে মেধাক্রম তৈরি করার প্রস্তাব রয়েছে।

এরপর মেধাক্রম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

তবে চূড়ান্ত নীতিমালা প্রকাশের আগে পরীক্ষার বিস্তারিত কাঠামো, সিলেবাস, সময় ও অন্যান্য নিয়মে পরিবর্তন আসতে পারে।

লটারি থেকে পরীক্ষায় কেন গুরুত্ব বাড়ছে প্রস্তুতির?।স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা ২০২৭

লটারি পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীর পরীক্ষার প্রস্তুতি সরাসরি ভর্তির ফল নির্ধারণ করত না। কিন্তু পরীক্ষা পদ্ধতি চালু হলে বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা হবে।

এবার একজন শিক্ষার্থীর পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান, প্রশ্ন বোঝার ক্ষমতা, দ্রুত উত্তর দেওয়ার দক্ষতা ও নির্ভুলতা—সবকিছু গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষ করে গণিতে ৪০ নম্বর থাকায় এই বিষয়ে ভালো প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।

আবার বাংলা ও ইংরেজি মিলিয়ে ৬০ নম্বর হওয়ায় শুধু গণিতে ভালো করলেই হবে না। তিন বিষয়েই ভারসাম্যপূর্ণ প্রস্তুতি নিতে হবে।

স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা ২০২৭

স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা ২০২৭ এ শিক্ষার্থীরা এখন থেকেই কীভাবে প্রস্তুতি নেবে?

ভর্তি পরীক্ষা সামনে রেখে শেষ মুহূর্তে পড়াশোনা শুরু করা ঠিক হবে না।

বরং এখন থেকেই প্রতিদিন অল্প অল্প করে প্রস্তুতি নেওয়া সবচেয়ে কার্যকর।

প্রথম ধাপে শিক্ষার্থীকে নিজের শ্রেণির পাঠ্যবই ভালোভাবে শেষ করতে হবে।

এরপর প্রতিটি বিষয়ের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় চিহ্নিত করে নিয়মিত অনুশীলন করতে হবে।

প্রস্তুতির মূল চারটি ধাপ হতে পারে-

পাঠ্যবই → অনুশীলন → মডেল টেস্ট → ভুল সংশোধন

শুধু বই পড়ে গেলে হবে না।

কোথায় ভুল হচ্ছে সেটি খুঁজে বের করে আবার অনুশীলন করতে হবে।

বাংলায় ৩০ নম্বরের প্রস্তুতি।স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা ২০২৭

বাংলা অংশে ভালো করতে হলে সাহিত্য ও ব্যাকরণ-দুই দিকেই নজর দিতে হবে।

নিজের শ্রেণির পাঠ্যবইয়ের প্রতিটি অধ্যায় বুঝে পড়ার পাশাপাশি ব্যাকরণের মৌলিক বিষয়গুলো অনুশীলন করা প্রয়োজন।

বিশেষভাবে প্রস্তুতি নেওয়া যেতে পারে-

  • বানান শুদ্ধি
  • শব্দের অর্থ
  • সমার্থক ও বিপরীত শব্দ
  • বাক্য গঠন
  • ব্যাকরণের মৌলিক নিয়ম
  • গদ্য ও পদ্যের মূলভাব
  • পাঠ্যবইভিত্তিক প্রশ্ন
  • অনুচ্ছেদ বা সংক্ষিপ্ত লিখিত উত্তর

বাংলায় মুখস্থনির্ভর পড়াশোনার পাশাপাশি প্রশ্ন বুঝে নিজের ভাষায় উত্তর দেওয়ার অভ্যাস তৈরি করা ভালো।

ইংরেজিতে ভালো নম্বর পাওয়ার কৌশল।স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা ২০২৭

ইংরেজির প্রস্তুতিতে Grammar-এর পাশাপাশি Vocabulary বা শব্দভান্ডারের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন কিছু নতুন ইংরেজি শব্দ শিখে সেগুলো দিয়ে ছোট বাক্য তৈরির অনুশীলন করতে পারে।

পাশাপাশি শ্রেণিভিত্তিক Grammar-এর নিয়ম বারবার অনুশীলন করা দরকার।

প্রস্তুতির তালিকায় থাকতে পারে-

  • Parts of Speech
  • Tense
  • Article
  • Preposition
  • Right Form of Verb
  • Synonym
  • Antonym
  • Vocabulary
  • Sentence Making
  • Fill in the blanks
  • Passage বা Comprehension

ইংরেজিতে ভালো করতে নিয়মিত পড়ার অভ্যাস সবচেয়ে বেশি কাজে দেবে।

গণিতে ৪০ নম্বর-এখানেই বাড়তি প্রস্তুতি

স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা ২০২৭-এর প্রস্তাবিত নম্বর বণ্টনে গণিতে সর্বোচ্চ ৪০ নম্বর রাখা হয়েছে।

তাই গণিতের প্রস্তুতিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া দরকার।

গণিতের ক্ষেত্রে শুধু সূত্র মুখস্থ করলে চলবে না। কোন প্রশ্নে কোন নিয়ম প্রয়োগ করতে হবে, সেটি বুঝতে হবে।

শিক্ষার্থীদের শ্রেণি অনুযায়ী সাধারণত যেসব বিষয় ভালোভাবে অনুশীলন করা প্রয়োজন, সেগুলোর মধ্যে থাকতে পারে-

স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা ২০২৭- ২
  • যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগ
  • ভগ্নাংশ
  • দশমিক
  • শতকরা
  • অনুপাত
  • গড়
  • লাভ-ক্ষতি
  • সময় ও পরিমাপ
  • জ্যামিতির মৌলিক ধারণা
  • বীজগণিতের প্রাথমিক বিষয়
  • শব্দভিত্তিক গাণিতিক সমস্যা

প্রতিদিন নির্দিষ্টসংখ্যক অঙ্ক সময় ধরে সমাধান করলে গতি ও নির্ভুলতা-দুটিই বাড়বে।

প্রতিদিনের পড়ার রুটিন কেমন হতে পারে?

ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য প্রতিদিন ৮-১০ ঘণ্টা পড়ার প্রয়োজন নেই।

বরং নিয়মিত ও মনোযোগী পড়াশোনা বেশি কার্যকর।

একটি নমুনা রুটিন হতে পারে-

সময়প্রস্তুতি
৪৫ মিনিটবাংলা
৪৫ মিনিটইংরেজি
৬০ মিনিটগণিত
৩০ মিনিটআগের পড়া রিভিশন
৩০ মিনিটমডেল প্রশ্ন
১৫ মিনিটভুলগুলো চিহ্নিত ও সংশোধন

শিক্ষার্থী নিজের শ্রেণি, স্কুলের পড়াশোনা ও সক্ষমতা অনুযায়ী এই সময়সূচি কম-বেশি করতে পারে।

মডেল টেস্ট ছাড়া প্রস্তুতি অসম্পূর্ণ।স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা ২০২৭

অনেক শিক্ষার্থী বই ভালোভাবে পড়েও পরীক্ষার হলে সময়ের অভাবে সব প্রশ্ন শেষ করতে পারে না। এর প্রধান কারণ পরীক্ষার পরিবেশে অনুশীলনের অভাব।

তাই সপ্তাহে অন্তত এক বা দুই দিন পূর্ণাঙ্গ মডেল টেস্ট দেওয়ার অভ্যাস করা যেতে পারে।

মডেল টেস্টের পর শুধু নম্বর দেখলেই হবে না।

দেখতে হবে-

  • কোন প্রশ্ন ভুল হয়েছে?
  • কেন ভুল হয়েছে?
  • সময় কোথায় বেশি লেগেছে?
  • কোন অধ্যায়ে দুর্বলতা রয়েছে?

এই চারটি প্রশ্নের উত্তর বের করতে পারলে পরবর্তী প্রস্তুতি অনেক বেশি কার্যকর হবে।

ভুলের খাতা তৈরি করবে শিক্ষার্থীরা

ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য একটি আলাদা ‘ভুলের খাতা’ তৈরি করা যেতে পারে।

গণিতে যে অঙ্ক ভুল হয়েছে, ইংরেজিতে যে Grammar ভুল হয়েছে কিংবা বাংলায় যে বানান বা প্রশ্নের উত্তর ভুল হয়েছে-সবগুলো সেখানে লিখে রাখতে হবে।

পরীক্ষার আগে এই খাতা বারবার দেখলে একই ভুল পুনরায় হওয়ার সম্ভাবনা কমবে।

সময়ের মধ্যে উত্তর দেওয়ার অভ্যাস করতে হবে

ভর্তি পরীক্ষায় শুধু সঠিক উত্তর জানা যথেষ্ট নয়; নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উত্তর দিতে পারাও গুরুত্বপূর্ণ।

তাই বাড়িতে প্রশ্ন সমাধানের সময় ঘড়ি বা টাইমার ব্যবহার করা যেতে পারে।

প্রথম দিকে ধীরে সমাধান হলেও নিয়মিত অনুশীলনে গতি বাড়বে।

সহজ প্রশ্ন আগে এবং তুলনামূলক কঠিন প্রশ্ন পরে করার অভ্যাসও তৈরি করা যেতে পারে।

তবে চূড়ান্ত পরীক্ষার নির্দেশনা প্রকাশের পর সেই অনুযায়ী কৌশল ঠিক করা উচিত।

অভিভাবকদের করণীয় কী?

ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে শিশুর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করা উচিত নয়।

বরং তার দুর্বলতা চিহ্নিত করে সঠিকভাবে সহযোগিতা করতে হবে।

অভিভাবকরা নিয়মিত জানতে পারেন-

  • আজ কী পড়েছে?
  • কোন বিষয় কঠিন লাগছে?
  • কোন অধ্যায়ে বেশি ভুল হচ্ছে?
  • মডেল টেস্টে কত নম্বর পেয়েছে?
  • সময়ের মধ্যে সব প্রশ্ন শেষ করতে পারছে কি না?

শুধু বেশি সময় পড়েছে কি না-এটি না দেখে পড়ার মান ও নিয়মিত অনুশীলনের দিকে গুরুত্ব দেওয়া ভালো।

পরীক্ষার আগের এক মাস কীভাবে প্রস্তুতি নেবে?

পরীক্ষা যত কাছে আসবে, নতুন বিষয় শেখার চেয়ে রিভিশনের গুরুত্ব তত বাড়বে।

শেষ এক মাসে শিক্ষার্থীরা-

প্রথম সপ্তাহ: দুর্বল অধ্যায় চিহ্নিত ও পুনরায় পড়া
দ্বিতীয় সপ্তাহ: বিষয়ভিত্তিক প্রশ্ন অনুশীলন
তৃতীয় সপ্তাহ: নিয়মিত মডেল টেস্ট
চতুর্থ সপ্তাহ: পূর্ণাঙ্গ রিভিশন ও ভুলের খাতা দেখা

এভাবে প্রস্তুতি ভাগ করে নিলে চাপ কমবে এবং নিজের অগ্রগতি বোঝা সহজ হবে।

পরীক্ষার আগের দিন কী করবে?

পরীক্ষার আগের রাতে নতুন কোনো অধ্যায় নিয়ে অতিরিক্ত চাপ নেওয়া উচিত নয়।

গুরুত্বপূর্ণ সূত্র, শব্দ, ব্যাকরণ ও আগে ভুল করা প্রশ্নগুলো সংক্ষেপে দেখে নেওয়া যেতে পারে।

ভর্তি পরীক্ষা

পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিকভাবে শান্ত থাকা জরুরি। পরীক্ষার প্রয়োজনীয় সামগ্রী আগে থেকেই প্রস্তুত করে রাখা ভালো।

একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি

এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য খসড়া নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে

মাউশি খসড়া তৈরি করলেও চূড়ান্ত অনুমোদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের।

তাই সরকারি চূড়ান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগে পরীক্ষার তারিখ, প্রশ্নের ধরন, সিলেবাস বা অন্যান্য শর্ত পরিবর্তিত হতে পারে।

সুতরাং অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজবের ওপর নির্ভর না করে মাউশি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি অনুসরণ করা উচিত।

শেষ মুহূর্তের অপেক্ষা নয়, প্রস্তুতি শুরু হোক এখনই

স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা ২০২৭ চালু হলে শিক্ষার্থীদের জন্য লটারির পরিবর্তে মেধা ও প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব বাড়বে।

প্রস্তাবিত ১০০ নম্বরের পরীক্ষায় বাংলা ৩০, ইংরেজি ৩০ এবং গণিতে ৪০ নম্বর থাকায় তিন বিষয়েই সমানভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভর্তি পরীক্ষার জন্য শুধু মুখস্থনির্ভর প্রস্তুতি না নিয়ে বুঝে পড়া, নিয়মিত অনুশীলন, সময় ধরে পরীক্ষা দেওয়া এবং ভুল থেকে শেখা-এই চারটি অভ্যাস তৈরি করা।

এখন থেকেই প্রতিদিনের পড়াশোনাকে একটু পরিকল্পিত করলে ভর্তি পরীক্ষার সময় অতিরিক্ত চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব।

আর চূড়ান্ত নীতিমালা প্রকাশের পর তার নির্দেশনা অনুযায়ী প্রস্তুতির শেষ ধাপ সাজিয়ে নেওয়াই হবে সবচেয়ে নিরাপদ কৌশল।

আরও পড়ুনঃ পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখার কার্যকর ৭টি টিপস।

প্রতিবেদকঃ কুলসুম আকতার শিমু