১০০ টাকায় শুরু, এখন বছরে আয় ৬ লাখ টাকা: কেঁচো সার তৈরি করে সফল উদ্যোক্তা আব্দুর রহিমের অনুপ্রেরণার গল্প

১০০ টাকায় শুরু এখন সফলতার অনন্য দৃষ্টান্ত

মাত্র ১০০ টাকায় শুরু করে আজ বছরে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা লাভ করছেন যশোরের মনিরামপুর উপজেলার উদ্যোক্তা আব্দুর রহিম।

১৬ বছর আগে গ্রামীণ ব্যাংকের দীর্ঘ ১৮ বছরের চাকরি ছেড়ে তিনি এমন একটি উদ্যোগ শুরু করেছিলেন,

যা তখন অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। মাত্র ১০০টি কেঁচো কিনে ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার উৎপাদন শুরু করেন তিনি।

বর্তমানে তাঁর খামারে বছরে প্রায় ২৪০ মেট্রিক টন জৈব সার উৎপাদন হয় এবং ১২ থেকে ১৪ লাখ টাকার

বিক্রি হয়। সব খরচ বাদ দিয়ে বছরে তাঁর লাভ দাঁড়ায় প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা।

আব্দুর রহিমের এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি প্রমাণ করে যে সঠিক পরিকল্পনা,

ধৈর্য এবং পরিশ্রম থাকলে অল্প পুঁজিতেও বড় ব্যবসা গড়ে তোলা সম্ভব।

চাকরি ছেড়ে কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা হওয়ার সিদ্ধান্ত

আব্দুর রহিম স্নাতকোত্তর শেষ করে গ্রামীণ ব্যাংকে চাকরি শুরু করেন।

দীর্ঘ ১৮ বছর চাকরি করার পর তিনি বুঝতে পারেন, নিজের কিছু করার মধ্যেই রয়েছে প্রকৃত স্বাধীনতা।

তাই স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে কৃষিভিত্তিক ব্যবসার দিকে ঝুঁকে পড়েন।

২০১১ সালে মাত্র ১০০ টাকা দিয়ে ১০০টি কেঁচো কিনে একটি ছোট পাত্রে কেঁচো সার উৎপাদনের কাজ শুরু করেন।

শুরুতে অনেকেই তাঁর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুললেও তিনি নিজের লক্ষ্য থেকে সরে আসেননি।

ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়তে থাকে এবং আজ সেই ছোট উদ্যোগই একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

কীভাবে তৈরি হয় ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার?

ভার্মি কম্পোস্ট হলো কেঁচোর মাধ্যমে তৈরি একটি উন্নতমানের জৈব সার।

এটি মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে এবং রাসায়নিক সারের বিকল্প হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

আব্দুর রহিমের খামারে প্রথমে বিভিন্ন এলাকা থেকে গোবর সংগ্রহ করা হয়।

এরপর খোলা জায়গায় প্রায় এক মাস রেখে গোবরের গ্যাস বের করা হয়।

পরে টিনশেডের নিচে ছায়াযুক্ত স্থানে ৭ থেকে ৮ ইঞ্চি পুরু করে বেড তৈরি করা হয়।

সেই বেডে নির্দিষ্ট পরিমাণ কেঁচো ছাড়া হয়। কেঁচো গোবর খেয়ে যে মল ত্যাগ করে, সেটিই উৎকৃষ্ট মানের জৈব সার।

নির্দিষ্ট সময় পর কেঁচো আলাদা করে সার সংগ্রহ করা হয় এবং বস্তাবন্দি করে বাজারজাত করা হয়।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় পরিবেশের কোনো ক্ষতি হয় না।

বরং জৈব বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব সার উৎপাদন সম্ভব হয়।

মাসে ২০ মেট্রিক টন উৎপাদন-১০০ টাকায় শুরু

বর্তমানে আব্দুর রহিমের প্রকল্পে পাঁচজন কর্মী নিয়মিত কাজ করেন। প্রতি মাসে প্রায় ২০ মেট্রিক টন ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদিত হয়।

যশোর ছাড়াও খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটসহ দেশের বিভিন্ন জেলার কৃষক ও সার ব্যবসায়ীরা তাঁর কাছ থেকে পাইকারি দরে সার কিনে থাকেন।

ভালো মানের কারণে তাঁর উৎপাদিত সারের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।

ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনা

শুরুতে আব্দুর রহিম খোলা অবস্থায় সার বিক্রি করতেন। তবে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ায় তিনি ব্র্যান্ডিংয়ের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।

পিকেএসএফের আর্থিক সহায়তায় নবলোক পরিষদ নামের একটি বেসরকারি সংস্থা তাঁকে প্যাকেটজাত করার

জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, ওজন মেশিন, সেলাই মেশিন এবং অন্যান্য উপকরণ সরবরাহ করে।

এছাড়া ট্রেড লাইসেন্স, জৈব সারের মান পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেশন সম্পন্ন করার ক্ষেত্রেও তাঁকে সহযোগিতা করা হয়।

ফলে তাঁর পণ্য এখন আরও বিশ্বাসযোগ্য এবং বাজারে গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

বছরে ১৪ লাখ টাকার বেচাকেনা

বর্তমানে আব্দুর রহিম বছরে প্রায় ২৪০ মেট্রিক টন কেঁচো সার উৎপাদন করেন।

এই উৎপাদন থেকে বছরে প্রায় ১২ থেকে ১৪ লাখ টাকার বিক্রি হয়।

উৎপাদন খরচ, শ্রমিকের বেতন, পরিবহন ও অন্যান্য ব্যয় বাদ দেওয়ার পর তাঁর হাতে বছরে

প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা লাভ থাকে।

একটি ছোট বিনিয়োগ থেকে এত বড় সাফল্য দেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য অনুপ্রেরণার উদাহরণ।

অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণা-১০০ টাকায় শুরু

আব্দুর রহিমের সফলতা দেখে মনিরামপুরসহ আশপাশের অনেক মানুষ এখন বাণিজ্যিকভাবে কেঁচো সার উৎপাদনে আগ্রহী হয়েছেন।

স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মতে, জৈব সারের চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

কারণ কৃষকরা এখন রাসায়নিক সারের বিকল্প হিসেবে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব সার ব্যবহার করতে আগ্রহী হচ্ছেন।

তবে তাঁরা মনে করেন, জৈব সারের দাম ও মান নিয়ন্ত্রণে সরকারি উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

পাশাপাশি লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজ করা এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করলে নতুন উদ্যোক্তারা আরও উৎসাহিত হবেন।

কেন বাড়ছে জৈব সারের গুরুত্ব?

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের কারণে দেশের অনেক এলাকার মাটির উর্বরতা কমে গেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, একটি উর্বর মাটিতে প্রায় ৫ শতাংশ জৈব পদার্থ থাকা প্রয়োজন।

অথচ বর্তমানে অনেক জায়গায় এই হার ১ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে।

এই পরিস্থিতিতে ভার্মি কম্পোস্টের মতো জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।

এটি শুধু মাটির উর্বরতা ফিরিয়ে আনে না, ফসলের উৎপাদনও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই রাখতে সহায়তা করে।

অল্প পুঁজিতে লাভজনক ব্যবসার সুযোগ-১০০ টাকায় শুরু

ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন এমন একটি ব্যবসা, যা খুব অল্প পুঁজিতে শুরু করা সম্ভব।

বাড়ির আঙিনা বা অল্প জায়গাতেও এটি করা যায়।

এই ব্যবসার প্রধান সুবিধাগুলো হলো-

  • খুব কম মূলধন প্রয়োজন।
  • কাঁচামাল সহজেই পাওয়া যায়।
  • পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা।
  • জৈব সারের বাজারে চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে।
  • নিয়মিত আয় এবং দীর্ঘমেয়াদে লাভের সুযোগ রয়েছে।

যারা চাকরির পাশাপাশি বাড়তি আয়ের উৎস খুঁজছেন অথবা নতুন উদ্যোক্তা হতে চান,

তাঁদের জন্য কেঁচো সার উৎপাদন একটি সম্ভাবনাময় খাত হতে পারে।

উপসংহার

১০০ টাকায় শুরু করা আব্দুর রহিমের যাত্রা আজ হাজারো মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা।

চাকরি ছেড়ে নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সাহস, কঠোর পরিশ্রম এবং ধৈর্যই তাঁকে সফল উদ্যোক্তায় পরিণত করেছে।

বর্তমানে তাঁর উদ্যোগ শুধু একটি লাভজনক ব্যবসা নয়, বরং পরিবেশবান্ধব কৃষি, জৈব সার উৎপাদন এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থানের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।

সরকারের প্রয়োজনীয় সহায়তা, সহজ ঋণ এবং বাজার ব্যবস্থাপনা আরও উন্নত হলে

আব্দুর রহিমের মতো অসংখ্য উদ্যোক্তা দেশের কৃষি ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবেন।

সম্পাদক