রোবট যাত্রীর জন্য এক ঘণ্টা আটকে রইল বিমান, পরে ব্যাটারি খুলেই উড়াল।পাঠকের প্রশ্ন-উত্তর পর্ব

রোবট যাত্রী – প্রযুক্তির অগ্রগতির এই যুগে রোবট এখন শুধু কারখানা বা গবেষণাগারেই সীমাবদ্ধ নেই।

বিভিন্ন অনুষ্ঠান, প্রদর্শনী ও বাণিজ্যিক কাজে রোবটের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। তবে সেই প্রযুক্তিই এবার তৈরি করল এক অদ্ভুত পরিস্থিতি।

একজন মানুষের জন্য নয়, বরং একটি রোবটের কারণে প্রায় এক ঘণ্টা বিলম্বে উড়তে হয়েছে একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজকে।

ঘটনাটি ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রের ওকল্যান্ড সান ফ্রান্সিসকো বে বিমানবন্দর-এ, যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা।

রোবট যাত্রী

ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ‘বেবপ’ নামের একটি রোবট।

এটি নিয়ে ভ্রমণ করছিলেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক Elite Event Robotics–এর কর্মকর্তা এলি বেন-আব্রাহাম।

তিনি গত বৃহস্পতিবার ওকল্যান্ড সান ফ্রান্সিসকো বে বিমানবন্দর থেকে সান ডিয়েগো যাওয়ার একটি ফ্লাইটে ওঠেন।

তাঁর সঙ্গে ছিল প্রায় ৪ ফুট লম্বা এবং ৭০ পাউন্ড ওজনের রোবট বেবপ, যেটিকে একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য পাঠানো হচ্ছিল।

সাধারণত বড় আকারের মালামাল বিমানের কার্গো অংশে পাঠানো হয়।

কিন্তু বেবপ ছিল একটি বিশেষ ধরনের রোবট এবং সেটিকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে যাত্রী হিসেবেই বিমানে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

এজন্য রোবটটির জন্য আলাদা টিকিটও কাটা হয়েছিল। বিষয়টি শুরুতে অনেকের কাছেই মজার মনে হলেও পরে সেটিই বড় জটিলতায় রূপ নেয়।

রোবট যাত্রী

বিমানটিতে ওঠার পর প্রথমে বেবপকে একটি আইল সিটে বসানো হয়।

আইল সিট হলো উড়োজাহাজের ভেতরে হাঁটাচলার পথের পাশের আসন।

কিন্তু কিছুক্ষণ পরই এয়ারলাইনসের ক্রুরা আপত্তি তোলেন।

কারণ Southwest Airlines–এর নীতিমালা অনুযায়ী বড় আকারের কোনো বস্তু বা ক্যারি–অন আইটেম আইল সিটে রাখা যায় না।

এতে জরুরি মুহূর্তে যাত্রীদের চলাচলে বাধা তৈরি হতে পারে।

এরপর রোবটটিকে জানালার পাশের আসনে সরিয়ে নেওয়া হয়।

অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো সমস্যা সেখানেই শেষ।

কিন্তু আসল ঝামেলা শুরু হয় তখনই।

বিমানের নিরাপত্তাকর্মী ও ক্রুরা রোবটটির ব্যাটারি, প্রযুক্তি ও কার্যপ্রণালী নিয়ে বিস্তারিত জানতে চান।

তারা জানতে চান এতে কী ধরনের ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়েছে, এটি কীভাবে পরিচালিত হয় এবং এর ভেতরে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান আছে কি না।

রোবট যাত্রী

এলি বেন-আব্রাহাম পরে একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেন, ক্রুরা রোবটটি খুলে পরীক্ষা করারও চেষ্টা করেন।

কারণ নিরাপত্তার দিক থেকে কোনো ঝুঁকি থাকলে সেটি পুরো ফ্লাইটের জন্য বিপজ্জনক হতে পারত।

বিশেষ করে লিথিয়াম ব্যাটারি নিয়ে বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলো খুবই সতর্ক।

অতীতে লিথিয়াম ব্যাটারি থেকে আগুন লাগার একাধিক ঘটনা ঘটেছে।

এজন্য অনেক এয়ারলাইনস ব্যাটারির আকার ও ক্ষমতা নিয়ে কঠোর নীতিমালা অনুসরণ করে।

রোবট যাত্রী

পরীক্ষা করে দেখা যায়, বেবপের ব্যবহৃত লিথিয়াম ব্যাটারি এয়ারলাইনসের অনুমোদিত সর্বোচ্চ সীমার চেয়ে বড়।

আর সেখানেই তৈরি হয় মূল সংকট।

নিরাপত্তা নীতিমালা অনুযায়ী এত বড় ব্যাটারি নিয়ে উড়োজাহাজে যাত্রা করার অনুমতি ছিল না।

ফলে বিমান কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয়, ব্যাটারি খুলে ফেলতে হবে।

পরে রোবটটির ব্যাটারি সরিয়ে নেওয়ার পরই উড়োজাহাজটি যাত্রার অনুমতি পায়।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় এক ঘণ্টার বেশি সময় পার হয়ে যায়।

এর ফলে বিমানের অন্য যাত্রীরা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে বাধ্য হন।

কেউ কেউ বিস্ময় প্রকাশ করেন যে, একটি রোবটের কারণে পুরো ফ্লাইট বিলম্বিত হতে পারে।

আবার অনেক যাত্রী ঘটনাটি মজার হিসেবেও দেখেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ে।

অনেকে বলেন, ভবিষ্যতে হয়তো রোবটদের জন্য আলাদা ভ্রমণ নীতিমালা তৈরি করতে হবে।

রোবট যাত্রী

এদিকে Southwest Airlines–এর মুখপাত্র লিন লান্সফোর্ড গণমাধ্যমকে জানান, সব সিদ্ধান্তই যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, এয়ারলাইনসের নিয়ম অনুযায়ী নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকতে পারে এমন কোনো সামগ্রী যাচাই ছাড়া বহন করা যায় না।

তাই রোবটটির ব্যাটারি পরীক্ষা ও অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

অন্যদিকে Elite Event Robotics জানিয়েছে, তারা ভবিষ্যতেও তাদের রোবট বাণিজ্যিক ফ্লাইটে পাঠাবে।

তবে এবার থেকে ব্যাটারি ছাড়া রোবট পরিবহনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যাতে এ ধরনের জটিলতা আর তৈরি না হয়।

যে অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য বেবপকে পাঠানো হচ্ছিল, সেটি যেন নির্ধারিত সময়েই সম্পন্ন করা যায়, সে জন্য আলাদা ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

রোবটটির ব্যাটারি দ্রুতগতিতে রাতারাতি শিকাগো শহরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

ফলে গন্তব্যে পৌঁছে আবার ব্যাটারি সংযুক্ত করে বেবপকে অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার উপযোগী করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আরও বাড়তে পারে।

কারণ এখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবট প্রযুক্তিকে ব্যবসা, বিনোদন ও সেবাখাতে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে।

তাই বিমান পরিবহন খাতেও নতুন ধরনের নীতিমালা ও নিরাপত্তা নির্দেশিকা প্রয়োজন হতে পারে।

ঘटनাটি শুধু একটি রোবটের ভ্রমণ নিয়ে নয়, বরং প্রযুক্তি ও নিরাপত্তার সমন্বয় কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটিও নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।

একই সঙ্গে এটি দেখিয়েছে, ভবিষ্যতের পৃথিবীতে মানুষ ও রোবট হয়তো আরও বেশি ক্ষেত্রেই একসঙ্গে যাত্রা করবে।

পাঠকের প্রশ্ন-উত্তর পর্ব-রোবট যাত্রী

১. ঘটনাটি কোথায় ঘটেছে?

ঘटनাটি যুক্তরাষ্ট্রের ওকল্যান্ড সান ফ্রান্সিসকো বে বিমানবন্দর-এ ঘটেছে। সেখান থেকে সান ডিয়েগো যাওয়ার একটি ফ্লাইটে এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

২. কেন বিমান উড়তে দেরি হয়েছিল?

বিমানে থাকা ‘বেবপ’ নামের একটি রোবটের কারণে উড়োজাহাজের যাত্রা প্রায় এক ঘণ্টা বিলম্বিত হয়। রোবটটির আসন, নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং ব্যাটারির আকার নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ায় ফ্লাইট ছাড়তে দেরি হয়।

৩. রোবটটির নাম কী ছিল?

রোবটটির নাম ছিল ‘বেবপ’। এটি একটি বড় আকারের ইভেন্ট রোবট, যেটি বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও প্রদর্শনীতে ব্যবহার করা হয়।

৪. রোবটটির মালিক কোন প্রতিষ্ঠান?

রোবটটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক Elite Event Robotics নামের একটি প্রতিষ্ঠানের। প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য রোবট ভাড়া দিয়ে থাকে।

৫. রোবটটির জন্য কি আলাদা টিকিট কাটা হয়েছিল?

হ্যাঁ। রোবট বেবপকে যাত্রী হিসেবেই বিমানে নেওয়া হয়েছিল এবং এজন্য আলাদা একটি টিকিটও কেনা হয়েছিল।

৬. প্রথম সমস্যা কোথায় তৈরি হয়?

প্রথমে রোবটটিকে বিমানের আইল সিটে বসানো হয়েছিল। কিন্তু Southwest Airlines–এর নিয়ম অনুযায়ী বড় আকারের কোনো বস্তু আইল সিটে রাখা যায় না। পরে সেটিকে জানালার পাশের আসনে সরিয়ে নেওয়া হয়।

৭. পরে নতুন কী সমস্যা দেখা দেয়?

বিমানকর্মীরা রোবটটির ব্যাটারি ও প্রযুক্তিগত দিক নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তারা জানতে চান এতে কী ধরনের ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়েছে এবং সেটি নিরাপদ কি না।

৮. কেন ব্যাটারি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল?

পরীক্ষা করে দেখা যায়, রোবটটির লিথিয়াম ব্যাটারি এয়ারলাইনসের অনুমোদিত সীমার চেয়ে বড়। বড় লিথিয়াম ব্যাটারি আগুন বা বিস্ফোরণের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে বিমান সংস্থাগুলো এ বিষয়ে খুব সতর্ক থাকে।

৯. শেষ পর্যন্ত কী করা হয়?

নিরাপত্তার স্বার্থে রোবটটির ব্যাটারি খুলে ফেলা হয়। ব্যাটারি সরানোর পরই উড়োজাহাজটি যাত্রা শুরু করার অনুমতি পায়।

১০. এতে অন্য যাত্রীদের কী অবস্থা হয়েছিল?

বিমানের অন্য যাত্রীরা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে বাধ্য হন। অনেকেই বিস্মিত হন যে একটি রোবটের কারণে পুরো ফ্লাইট দেরিতে ছাড়তে পারে।

১১. এয়ারলাইনস কী ব্যাখ্যা দিয়েছে?

Southwest Airlines জানিয়েছে, যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা নীতিমালা মেনেই রোবটটির ব্যাটারি অপসারণ করা হয়।

১২. রোবটটি কোথায় পাঠানো হচ্ছিল?

রোবট বেবপকে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য পাঠানো হচ্ছিল। অনুষ্ঠানে সময়মতো পৌঁছাতে পরে আলাদাভাবে ব্যাটারি পাঠানো হয়।

১৩. ব্যাটারিটি কোথায় পাঠানো হয়েছিল?

রোবটটির ব্যাটারি দ্রুতগতিতে শিকাগো শহরে পাঠানো হয়, যাতে সেখানে গিয়ে পুনরায় সেটি ব্যবহার করা যায়।

১৪. ভবিষ্যতে কি রোবট বিমানে ভ্রমণ করবে?

প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ভবিষ্যতেও তারা রোবট বাণিজ্যিক ফ্লাইটে পাঠাবে। তবে পরবর্তীতে ব্যাটারি ছাড়া রোবট পরিবহনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

১৫. এই ঘটনা কেন এত আলোচনায় এসেছে?

কারণ এটি প্রযুক্তি ও বাস্তব জীবনের একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ। একটি রোবটের কারণে পুরো উড়োজাহাজ বিলম্বিত হওয়া সাধারণ মানুষের কাছে বেশ বিস্ময়কর ও মজার ঘটনা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

বিমানযাত্রায় রোবট যাত্রী নিয়ে সমস্যার খবরের জন্য ১৫টি ট্যাগ:

রোবট যাত্রী, বিমানযাত্রা, লিথিয়াম ব্যাটারি, ফ্লাইট বিলম্ব, এয়ারপোর্ট নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট, প্রযুক্তি সমস্যা, স্মার্ট রোবট, যাত্রী নিরাপত্তা, এভিয়েশন নিউজ, বিমান দুর্ঘটনা এড়ানো, আধুনিক প্রযুক্তি, ফ্লাইট আপডেট, ট্রাভেল নিউজ, বিশ্ব সংবাদ

সম্পাদক

মোঃ নাইয়ার আযম,সহকারী অধ্যাপক(পদার্থবিজ্ঞান),মজিদা খাতুন মহিলা কলেজ, রংপুর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *