জাতীয় সাদাকাতুল ফিতর হার ২০২৬: সর্বনিম্ন ১১০, সর্বোচ্চ ২৮০৫ টাকা নির্ধারণ।পাঠকের প্রশ্ন-উত্তর পর্ব

চলতি বছরের জাতীয় সাদাকাতুল ফিতর হার নির্ধারণ করেছে জাতীয় সাদাকাতুল ফিতর নির্ধারণ কমিটি।

কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জন্য জনপ্রতি সর্বনিম্ন ফিতরা ১১০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২ হাজার ৮০৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রতিবছরের মতো এবারও খাদ্যপণ্যের বাজারমূল্য বিশ্লেষণ করে এই হার নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে সাধারণ মুসলমানরা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী ফিতরা আদায় করতে পারেন।

কোথায় ও কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়

বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে ইসলামিক ফাউন্ডেশন–এর সভাকক্ষে আয়োজিত এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

সভায় সভাপতিত্ব করেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব ও কমিটির সভাপতি মুফতি মাওলানা আবদুল মালেক। উপস্থিত ছিলেন কমিটির সদস্যবৃন্দ ও দেশের খ্যাতনামা আলেমরা।

সভায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারদর পর্যালোচনা করে আটা, যব, কিশমিশ, খেজুর ও পনিরের গড় মূল্য বিবেচনায় এনে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ ফিতরার হার নির্ধারণ করা হয়।

ইসলামী শরিয়াহর নির্দেশনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য বা তার সমমূল্যের অর্থ প্রদানই সাদাকাতুল ফিতর আদায়ের মূল ভিত্তি।

শরিয়াহ অনুযায়ী সাদাকাতুল ফিতর কী (জাতীয় সাদাকাতুল ফিতর হার)

সাদাকাতুল ফিতর হলো রমজান মাস শেষে ঈদের নামাজের আগে আদায়যোগ্য একটি ওয়াজিব দান।

এর উদ্দেশ্য হলো দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত মুসলমানদের ঈদের আনন্দে শরিক করা এবং রোজার ত্রুটি-বিচ্যুতি পরিশুদ্ধ করা।

ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী, যাদের ওপর যাকাত ফরজ নয় কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচের অতিরিক্ত সম্পদ আছে, তাদের ওপরও ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব।

প্রত্যেক মুসলমানকে নিজের ও তার অধীনস্থ পরিবারের সদস্যদের পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করতে হয়। অর্থাৎ পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জন্য আলাদাভাবে নির্ধারিত হারে ফিতরা দিতে হবে।

নির্ধারিত পণ্য ও পরিমাণ

২০২৬ সালের জাতীয় সাদাকাতুল ফিতর হার নির্ধারণে যে পণ্যগুলোর ভিত্তি ধরা হয়েছে, সেগুলোর পরিমাণ ও বাজারমূল্য হলো-

  • আটা বা গম: ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম অথবা এর বাজারমূল্য ১১০ টাকা (সর্বনিম্ন হার)
  • যব: ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম অথবা বাজারমূল্য ৫৯৫ টাকা
  • কিশমিশ: ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম অথবা বাজারমূল্য ২,৬৪০ টাকা
  • খেজুর: ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম অথবা বাজারমূল্য ২,৪৭৫ টাকা
  • পনির: ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম অথবা বাজারমূল্য ২,৮০৫ টাকা (সর্বোচ্চ হার)

ইসলামী ফিকহ অনুযায়ী, উল্লিখিত খাদ্যপণ্যের যেকোনো একটি দিয়ে ফিতরা আদায় করা বৈধ।

কেউ চাইলে সরাসরি খাদ্যদ্রব্য দিতে পারেন, আবার কেউ চাইলে এর সমমূল্যের নগদ অর্থ প্রদান করতে পারেন।

সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ হারের ব্যাখ্যা (জাতীয় সাদাকাতুল ফিতর হার)

অনেকেই জানতে চান-কেন সর্বনিম্ন ১১০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২,৮০৫ টাকা? এর কারণ হলো, শরিয়াহতে নির্ধারিত পণ্যের মান ও বাজারদর ভিন্ন ভিন্ন।

আটা বা গমের মূল্য তুলনামূলক কম হওয়ায় সেটির ভিত্তিতে সর্বনিম্ন হার নির্ধারণ করা হয়েছে।

অন্যদিকে পনিরের বাজারমূল্য বেশি হওয়ায় সেটির ভিত্তিতে সর্বোচ্চ হার দাঁড়িয়েছে ২,৮০৫ টাকা।

অতএব, যার সামর্থ্য বেশি তিনি উচ্চমূল্যের পণ্যের সমপরিমাণ ফিতরা দিতে পারেন।

আবার সীমিত আয়ের মানুষ সর্বনিম্ন হার অনুযায়ী ফিতরা আদায় করলেও তা শরিয়াহসম্মত হবে।

স্থানীয় বাজারদরের গুরুত্ব(জাতীয় সাদাকাতুল ফিতর হার)

কমিটির সভাপতি মুফতি মাওলানা আবদুল মালেক জানিয়েছেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্যপণ্যের খুচরা বাজারদরে পার্থক্য থাকতে পারে।

তাই স্থানীয় বাজারদর অনুযায়ী নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করলেও ফিতরা আদায় হবে।

অর্থাৎ জাতীয়ভাবে একটি গড় হার ঘোষণা করা হলেও বাস্তবে এলাকার বাজারদর বিবেচনায় নেওয়া যাবে।

এতে করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও সহজে ও সঠিকভাবে ফিতরা আদায় করতে পারবেন।

কখন ফিতরা আদায় করা উত্তম

রমজান মাস শেষ হওয়ার আগেই, বিশেষ করে ঈদের নামাজের পূর্বে ফিতরা আদায় করা উত্তম।

তবে প্রয়োজনে রমজানের শেষ কয়েকদিন আগেও তা দেওয়া যায়, যাতে দরিদ্ররা ঈদের প্রস্তুতি নিতে পারেন।

ঈদের নামাজের পর ফিতরা দিলে তা সাধারণ সদকা হিসেবে গণ্য হতে পারে-এ বিষয়ে আলেমদের মতামত রয়েছে।

ঈদুল ফিতর ও ফিতরার সম্পর্ক-জাতীয় সাদাকাতুল ফিতর হার

চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ২০ বা ২১ মার্চ পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হতে পারে। ঈদুল ফিতরের আগে ফিতরা আদায়ের মাধ্যমে মুসলমানরা সামাজিক সহমর্মিতা ও সাম্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

ধনী-গরিব সবাই যেন ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে পারেন-এটাই সাদাকাতুল ফিতরের মূল দর্শন।

উল্লেখ্য, গত বছরও ফিতরার হার একই ছিল। বাজারমূল্যের বড় ধরনের পরিবর্তন না হওয়ায় এবারও একই হার বহাল রাখা হয়েছে।

সামাজিক ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য

জাতীয় সাদাকাতুল ফিতর হার শুধু একটি আর্থিক পরিমাপ নয়; এটি মুসলিম সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

ফিতরার মাধ্যমে সমাজের সচ্ছল অংশ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ায়। এতে সামাজিক বৈষম্য কিছুটা হলেও লাঘব হয় এবং ঈদের দিন সবাই আনন্দে অংশ নিতে পারে।

আধ্যাত্মিক দিক থেকেও ফিতরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রমজানের রোজা পালনের সময় অনিচ্ছাকৃত ভুলত্রুটি হয়ে গেলে ফিতরা তা পরিশুদ্ধ করে-এমনটাই ইসলামী শিক্ষায় বর্ণিত হয়েছে।

পাঠকের প্রশ্ন-উত্তর পর্ব: জাতীয় সাদাকাতুল ফিতর হার ২০২৬

প্রশ্ন ১: ২০২৬ সালে জাতীয় সাদাকাতুল ফিতর হার কত নির্ধারণ করা হয়েছে?
উত্তর: জাতীয় সাদাকাতুল ফিতর নির্ধারণ কমিটি ২০২৬ সালের জন্য জনপ্রতি সর্বনিম্ন ১১০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২,৮০৫ টাকা ফিতরা নির্ধারণ করেছে।

প্রশ্ন ২: সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ হারের পার্থক্য কেন?
উত্তর: শরিয়াহ অনুযায়ী বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের ভিত্তিতে ফিতরা নির্ধারণ করা হয়। আটা বা গমের মূল্য কম হওয়ায় সর্বনিম্ন হার ১১০ টাকা এবং পনিরের মূল্য বেশি হওয়ায় সর্বোচ্চ হার ২,৮০৫ টাকা নির্ধারিত হয়েছে।

প্রশ্ন ৩: কোন কোন পণ্যের ভিত্তিতে ফিতরা আদায় করা যাবে?
উত্তর: আটা/গম, যব, কিশমিশ, খেজুর ও পনিরের নির্ধারিত পরিমাণ বা সমমূল্যের অর্থ দিয়ে ফিতরা আদায় করা যাবে।

প্রশ্ন ৪: নগদ অর্থে ফিতরা দেওয়া যাবে কি?
উত্তর: হ্যাঁ। নির্ধারিত খাদ্যপণ্যের সমমূল্যের নগদ অর্থ প্রদান করলেও ফিতরা আদায় হবে।

প্রশ্ন ৫: স্থানীয় বাজারদর ভিন্ন হলে কী করতে হবে?
উত্তর: দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্যের দাম কম-বেশি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে স্থানীয় খুচরা বাজারদর অনুযায়ী সমমূল্য পরিশোধ করলেও ফিতরা বৈধ হবে।

প্রশ্ন ৬: কবে ফিতরা আদায় করা উত্তম?
উত্তর: ঈদের নামাজের আগে ফিতরা আদায় করা উত্তম। রমজানের শেষ কয়েকদিনের মধ্যেও দেওয়া যায়, যাতে দরিদ্ররা ঈদের প্রস্তুতি নিতে পারেন।

প্রশ্ন ৭: কার ওপর ফিতরা দেওয়া ওয়াজিব?
উত্তর: যে মুসলমান নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচের অতিরিক্ত সম্পদের মালিক, তার ওপর নিজের ও পরিবারের সদস্যদের পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব।

প্রশ্ন ৮: ঈদুল ফিতরের সঙ্গে ফিতরার সম্পর্ক কী?
উত্তর: ঈদুল ফিতর–এর আগে ফিতরা আদায় করা হয়, যাতে দরিদ্র মুসলমানরাও ঈদের আনন্দে অংশ নিতে পারেন এবং রোজার ত্রুটি-বিচ্যুতি পরিশুদ্ধ হয়।

উপসংহার

২০২৬ সালের জাতীয় সাদাকাতুল ফিতর হার অনুযায়ী জনপ্রতি সর্বনিম্ন ১১০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২,৮০৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সামর্থ্য অনুযায়ী নির্ধারিত পণ্য বা তার সমমূল্যের অর্থ প্রদান করলেই ফিতরা আদায় হবে।

স্থানীয় বাজারদর বিবেচনার সুযোগ থাকায় দেশের সব অঞ্চলের মুসলমানরা সহজেই এ বিধান অনুসরণ করতে পারবেন।

সামর্থ্য অনুযায়ী যথাসময়ে ফিতরা আদায় করে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই হোক আমাদের সবার লক্ষ্য।

সম্পাদক

মোঃ নাইয়ার আযম,সহকারী অধ্যাপক(পদার্থবিজ্ঞান),মজিদা খাতুন মহিলা কলেজ, রংপুর।