বাংলাদেশ বড় ভূমিকম্প সতর্কতা-বাংলাদেশের উদ্বেগ
বাংলাদেশ ভূমিকম্প প্রবণ দেশ-এ কথাটি আমরা বহুবার শুনেছি, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের ঘনঘন ভূমি কম্পন সাধারণ মানুষকে আবারও ভাবিয়ে তুলেছে।
বিশেষ করে ঢাকায় অনুভূত শক্তিশালী ভূমিকম্প দেশজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলছে, “যেকোনো সময় বাংলাদেশে আরও বড় ভূমিকম্প হতে পারে।” এ সতর্কতার পেছনে রয়েছে ইতিহাস, ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতা এবং চলমান ভূ-চাপের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।
বাংলাদেশ বড় ভূমিকম্প সতর্কতা -এখন শুধু গবেষকদের মুখের কথা নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার একটি বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল সক্রিয় ফল্ট লাইনের ওপর অবস্থান করায় বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি সব সময় থাকে।
এই আর্টিকেলে আলোচনা করে হবে-
- কেন বাংলাদেশে বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা বাড়ছে
- বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন
- ভূমিকম্পের ইতিহাস
- ঝুঁকি কমাতে করণীয়
- সরকার, নগর পরিকল্পনা এবং সাধারণ মানুষের প্রস্তুতির অভাব
- ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকার জন্য বিশেষ সতর্কতা
- আন্তর্জাতিক গবেষণার মতামত

ভূমিকম্পের সাম্প্রতিক কম্পন: উদ্বেগের মূল কারণ কী
২১ নভেম্বর ২০২৫ইং দুপুরে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হয়, যা বিগত কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াত কবির বলেন-
“ঢাকা এবং এর আশপাশে সাম্প্রতিক যে কম্পন হয়েছে, এটি এই অঞ্চলের সাম্প্রতিক দশকের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলোর একটি। যেকোনো সময় আরও বড় ভূমিকম্প হতে পারে।”
তার মতে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৪ থেকে ৫ মাত্রার সামান্য বেশি কম্পন অনুভূত হলেও এসবের উৎপত্তি ছিল দেশের বাইরে। কিন্তু ঢাকার কম্পন স্থানীয় ভূমিকম্প চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কেন বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ
বাংলাদেশ তিনটি প্রধান টেকটোনিক ফল্ট লাইনের সংযোগস্থলে অবস্থিত। এগুলো হলো-
- ইন্ডিয়ান প্লেট
- বার্মা প্লেট
- ইউরেশিয়ান প্লেট
এই প্লেটগুলোর ক্রমাগত সংঘর্ষ ও চাপ সৃষ্টি করে ভূমিকম্প। ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ড. হুমায়ুন আখতার বলেন-
“এ অঞ্চলটি ভূমিকম্পের জন্য অত্যন্ত সক্রিয়। প্লেট সরে যাচ্ছে, চাপ তৈরি হচ্ছে এবং এই চাপ নির্দিষ্ট সময়ে বড় আকারের ভূমিকম্প ঘটাতে পারে। আমরা বারবার সরকারকে বলেছি, প্রস্তুতি ছাড়া উপায় নেই।”
বাংলাদেশে সক্রিয় প্রধান ভূমিকম্প অঞ্চলগুলো হলো–
- চিটাগাং-টেকনাফ ফল্ট জোন
- সিলেট-ডাউকি ফল্ট
- মধুপুর ফল্ট জোন
- দার্জিলিং-ভুটান ফল্ট
- আরাকান মেগাথ্রাস্ট
এই অঞ্চলগুলোর কোনো একটিতে বড় ভূমিকম্প ঘটলে বাংলাদেশ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়বে।
ইতিহাস বলছে-এ অঞ্চল বড় ভূমিকম্পের জন্য প্রস্তুত
১৮৯৭, ১৮৮৫, ১৯১৮, ১৯৩০, ১৯৫০-এই সবগুলো ভূমিকম্প ছিল বিধ্বংসী। ইতিহাসে উল্লেখ আছে-
১৯১৮ সালে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ৮.০ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল।
এটি ছিল দেশের ভেতরে হওয়া সর্বোচ্চ মাত্রার ভূমিকম্প।
২০০৩ সালের রাঙ্গামাটি ভূমিকম্প
রাঙ্গামাটির বরকল অঞ্চলে ভারত সীমান্তের কাছে ৫.৬ মাত্রার ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, তার তীব্রতা ছিল উল্লেখযোগ্য।
এত ইতিহাসও বলে-বাংলাদেশ বড় ভূমিকম্প সতর্কতা কোনো নতুন আলোচনা নয়; বরং বাস্তব ঝুঁকি।

ঢাকার জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ: ঘনবসতি , দুর্বল ভবন , পরিকল্পনার অভাব
ঢাকা শহর বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর একটি। দুই কোটি মানুষের নগরী ঢাকায়-
- অপরিকল্পিত ভবন
- দুর্বল নির্মাণশৈলী
- সরু রাস্তা
- পর্যাপ্ত উন্মুক্ত স্থান না থাকা
- উদ্ধারকাজের সীমাবদ্ধতা
সব মিলিয়ে ঢাকা এক ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ড. হুমায়ুন আখতার আরও বলেন-
“সরকার কোটি কোটি টাকার বাজেট দেয় উদ্ধার কাজে। কিন্তু ভূমিকম্পের আগে প্রস্তুতি না নিলে উদ্ধার কাজ কোনো কাজে আসবে না। মহড়ার বিকল্প নেই।”
ঢাকার পুরান অংশে ৭৫%-এর বেশি ভবন নড়বড়ে ও ঝুঁকিপূর্ণ। বড় ভূমিকম্প হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে ঢাকায়।
সাম্প্রতিক কম্পন কি বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস?
বিশেষজ্ঞরা বলেন-
“এটি সরাসরি বড় ভূমিকম্পের সিগন্যাল নয়, তবে এটি ইঙ্গিত দেয় যে চাপ বাড়ছে।”
ভূমিকম্প সাধারণত দুটি ধরনের সিগন্যাল দিতে পারে-
- ছোট ছোট কম্পন
- মাঝারি মাত্রার ঘনঘন ভূমিকম্প
সাম্প্রতিক সক্রিয়তা দেখাচ্ছে-বাংলাদেশের টেকটোনিক অঞ্চলে চাপ জমছে।
বিশ্বের গবেষকরা কী বলছে
আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুযায়ী বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলে একটি বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা বহু বছর ধরেই উচ্চ। যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীদের একটি গবেষণায় বলা হয়েছিল-
“আরাকান মেগাথ্রাস্টে ৮.২ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা আছে।”
এই মেগাথ্রাস্টে চাপ জমলে বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল, ঢাকা ও কলকাতার বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বাংলাদেশ বড় ভূমিকম্প সতর্কতা-গবেষকদের বিস্তারিত মতামত
১. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞান বিভাগ
- ঢাকার নিচে সক্রিয় ফল্ট লাইন সক্রিয় রয়েছে
- ভূগর্ভে গ্যাস, পানি ও বালুর চাপ দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে
- নির্মাণ মান নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি
- নদী খননের ফলে মাটির স্থিতিস্থাপকতা কমেছে
২. জাতীয় ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র
- সাম্প্রতিক কম্পন ঢাকার কাছাকাছি অঞ্চলেই হয়েছে
- এই অঞ্চলে বড় ভূমিকম্পের ইতিহাস রয়েছে
- সতর্কতা ও মনিটরিং বাড়ানো জরুরি
৩. আন্তর্জাতিক গবেষণা দল
- বাংলাদেশের ভূ-প্লেটে চাপ অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে
- আরাকান মেগাথ্রাস্ট বড় ঝুঁকি
- বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমার ত্রিভুজ অঞ্চল এখন সবচেয়ে সক্রিয়
বড় ভূমিকম্প হলে বাংলাদেশে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি
১. অবকাঠামোর ব্যাপক ধ্বংস
ঢাকার ৭০% ভবন ভূমিকম্প-সহনশীল নয়।
চট্টগ্রাম, সিলেট ও রংপুরেও একই চিত্র।
২. যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে
- সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে
- সেতু ভেঙে যেতে পারে
- উদ্ধার দল আটকে যাবে
৩. গ্যাস পাইপলাইন বিস্ফোরণ
পুরনো গ্যাস লাইনের কারণে ভয়ংকর আগুন লাগতে পারে।
৪. হাসপাতালে চাপ
ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হলে জরুরি চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
৫. মানবিক বিপর্যয়
হাজার হাজার মানুষ হতাহত হতে পারে।
সরকারি প্রস্তুতির কোথায় ঘাটতি
যদিও সরকার প্রকল্প গ্রহণ করেছে, তবে বাস্তবতা হলো—
- মহড়া খুব কম
- বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন নেই
- ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের নজরদারি দুর্বল
- নগর পরিকল্পনা অবহেলিত
ঢাকার বিল্ডিং কোড (BNBC) অনুযায়ী ভবন নির্মাণ বাধ্যতামূলক হলেও ৬০% ভবন এ কোড মানে না।
ঝুঁকি কমাতে কী করা জরুরি
১. জাতীয় পর্যায়ে করণীয়
- বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে বাস্তবায়ন
- পুরান ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রামে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভেঙে পুনর্নির্মাণ
- জরুরি সড়ক সম্প্রসারণ
- উদ্ধার টিমের আধুনিক প্রশিক্ষণ
২. ব্যক্তি পর্যায়ে করণীয়
- পরিবারের সদস্যদের মহড়া করা
- ভারী আলমারি, টিভি, ফ্রিজ দেয়ালের সঙ্গে আটকানো
- জরুরি ব্যাগ তৈরি রাখা
- গ্যাস-ইলেকট্রিক লাইন নিরাপদ করা
৩. স্কুল ও অফিস পর্যায়ে করণীয়
- মাসিক মহড়া
- জরুরি নির্গমন পথ পরিষ্কার
- স্টাফদের প্রশিক্ষণ

বিশেষজ্ঞদের আরও কিছু মন্তব্য
ড. জাহিদ হোসেন, ভূমিকম্প গবেষক:
“বাংলাদেশে বড় ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা নিশ্চিত। শুধু সময় জানা নেই। প্রস্তুতি নেওয়ার এখনই সময়।”
জাপানের ভূমিকম্প গবেষক ড. তাকাশি:
“ঢাকার ভবনগুলোর মান অত্যন্ত দুর্বল। একই মাত্রার ভূমিকম্প জাপানে হলে ক্ষতি কম হয়-কিন্তু বাংলাদেশে হবে ভয়াবহ।”
ভারতের ভূ-তত্ত্ববিদ ড. সুবীর ঘোষ:
“ডাউকি ফল্ট খুবই বিপজ্জনক। এটি সক্রিয় হলে বাংলাদেশ সরাসরি আঘাত পাবে।”
মিডিয়ার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ বড় ভূমিকম্প সতর্কতা
বাংলাদেশ বড় ভূমিকম্প সতর্কতা নিয়ে সচেতনতা তৈরির জন্য মিডিয়ার জরুরি ভূমিকা রয়েছে।
সংবাদমাধ্যম যদি নিয়মিত মহড়া, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা এবং সরকারি পদক্ষেপ প্রকাশ করে-তবে সাধারণ মানুষও প্রস্তুত হতে পারবে।
বাংলাদেশ বড় ভূমিকম্প সতর্কতা: এখনই সময় প্রস্তুতি নেওয়ার
বাংলাদেশে ভূমিকম্প হওয়া নতুন কিছু নয়। কিন্তু ঘনবসতি, অপরিকল্পিত শহর, দুর্বল ভবন এবং অপর্যাপ্ত প্রস্তুতি বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। সাম্প্রতিক কম্পন আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে-ঝুঁকি আসলেই আছে, এবং যেকোনো সময় তা বড় আকার নিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা এক বাক্যে যা বলছে-
“প্রস্তুতি ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।”
উপসংহার–বাংলাদেশ বড় ভূমিকম্প সতর্কতা
বাংলাদেশ বড় ভূমিকম্প সতর্কতা এখন আর তাত্ত্বিক বিষয় নয়; বরং দেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার বড় প্রশ্ন। ভূমিকম্প কখন হবে, তা কেউ বলতে পারে না-কিন্তু প্রস্তুতি নিলে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। সরকার, বিশেষজ্ঞ, মিডিয়া এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া বড় বিপর্যয় ঠেকানো যাবে না। এখনই সময় সচেতন হওয়ার, এখনই সময় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার, এখনই সময় ভূমিকম্প-সহনশীল বাংলাদেশ গড়ার।
আরও পড়ুন
আরটিকেলটি লিখেছেনঃ মোছাঃ কুলসুম আকতার শিমু ।
সম্পাদক
মোঃ নাইয়ার আযম,সহকারী অধ্যাপক(পদার্থবিজ্ঞান),মজিদা খাতুন মহিলা কলেজ, রংপুর।

নাইয়ার আযম একজন নিবেদিতপ্রাণ পদার্থবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক। তিনি মজিদা খাতুন মহিলা কলেজ,রংপুর এ কর্মরত আছেন এবং Studentbarta.com-ওয়েব সাইডের সম্পাদক। তিনি শিক্ষা ও অনলাইন শিক্ষার প্রতি গভীরভাবে অনুরাগী এবং নিয়মিতভাবে শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করার মতো চিন্তাশীল লেখা প্রকাশ করেন। তার শিক্ষা জীবন শুরু হয় ক্যান্ট পাবলিক স্কুল থেকে এবং পরবর্তীতে তিনি কারমাইকেল কলেজ, রংপুর-এ উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। বর্তমানে রংপুর সিটি-তে বসবাসরত নাইয়ার আযম সবসময় শিক্ষা, অনলাইন লার্নিং এবং শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে আগ্রহী। পদার্থবিজ্ঞানের জ্ঞানকে সহজবোধ্যভাবে উপস্থাপন এবং আধুনিক শিক্ষার সুযোগ প্রসারে তিনি বিশেষভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।